সুদিনের অপেক্ষায় শৈশব – দেশে বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কন্যা শিশু

মুনাফার জন্য যখন একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া হয়, তখন তার পরিণতি কী হয়? বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যৌন নিপীড়ন ও পাচার এখনো শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি। প্রতারণা, জবরদস্তি ও নির্যাতনের মাধ্যমে শিশুদের এই অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ তারা সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৪ সালের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩০ হাজার কন্যাশিশু যৌন পাচারের মাধ্যমে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এটি প্রতিবেদনে উল্লেখিত একটি আনুমানিক হিসাব, পূর্ণাঙ্গ জাতীয় গণনা নয়। পাচারকারীরা পতিতালয়, আবাসিক হোটেল ও অন্যান্য স্থানে শিশুদের নিপীড়ন করে। চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও ঋণের ফাঁদে ফেলে তাদের আটকে রাখা হয়। কিছু শিশু মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই যৌন নিপীড়নের শিকার হতে থাকে।

দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক নির্যাতন  ও শিক্ষার সীমিত সুযোগ শিশুদের পাচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। টিআইপি প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের ফাঁদে ফেলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মুঠোফোনের বার্তা ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এই অপরাধের দায় কোনোভাবেই নিপীড়নের শিকার শিশুদের নয়; দায় অপরাধীদের এবং সেই ব্যবস্থার যা এ ধরনের নিপীড়ন চলতে দেয়।

সমস্যার সমাধান শুধু ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাদের নিরাপত্তা, মানসিক পুনরুদ্ধার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের টিআইপি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সরকার পাচারের শিকার ১,২১০ জনকে শনাক্ত করে, যাদের মধ্যে ২১০ জন যৌন পাচারের শিকার ছিলেন। এ ছাড়া নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সব ধরনের পাচারের শিকার আরও ১০,১৩৫ জনকে শনাক্ত করার তথ্য জানিয়েছে। এসব সংখ্যা শনাক্ত হওয়া ভুক্তভোগীদের হিসাব, পাচারের প্রকৃত ব্যাপকতার পরিমাপের শুধু ধারণা মাত্র ।

সম্প্রতি পালিত আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি মেয়েশিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা লাভ এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। এ বছরের দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিতে বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু যৌন নিপীড়ন ও পাচারের শিকার শিশুদের জন্য শুধু সচেতনতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা, বিশেষায়িত আশ্রয়কেন্দ্র, মানসিক ও সামাজিক সহায়তা, শিক্ষার সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে এবং সামাজিক কলঙ্ক ও পুনরায় নির্যাতনের ঝুঁকি থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে হবে।

কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা মানে শুধু তাদের শোষণ থেকে উদ্ধার করা নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকেই শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে বেড়ে উঠতে না হয়। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, পাচারের পেছনে থাকা অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিশুদের জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি কন্যাশিশু যেন ভয় ও শোষণমুক্ত পরিবেশে নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।

Leave a Reply